নিজস্ব প্রতিবেদক
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, প্রতারণা, রাজস্ব ফাঁকি, অর্থ আত্মসাৎ এবং সম্ভাব্য মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আলোচনায় এসেছে গাজীপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফাহিম গ্রুপ ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফাহিম অ্যাটায়ার অ্যান্ড কম্পোজিট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে প্রতিশ্রুত পণ্য সরবরাহ না করার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস উদ্যোক্তা এবং বন্দর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিদেশ থেকে কম দামে ফেব্রিক্স আমদানির আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অগ্রিম বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না করে দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থের একটি বড় অংশ ফাহিম অ্যাটায়ার অ্যান্ড কম্পোজিট লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে।
২০-৩০ কন্টেইনার নিয়ে রহস্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফাহিম গ্রুপের নামে আমদানি করা ২০ থেকে ৩০টিরও বেশি কন্টেইনার দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—যদি কন্টেইনারগুলোতে বৈধভাবে ঘোষিত পণ্যই থাকে, তাহলে মাসের পর মাস সেগুলো খালাস করা হচ্ছে না কেন?
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কন্টেইনারগুলোর ঘোষণাপত্র, প্রকৃত পণ্য, শুল্ক মূল্যায়ন এবং বন্ড সুবিধার যথাযথ ব্যবহার নিয়ে তদন্ত প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এসব কন্টেইনার জনমনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
প্রতারণার নেপথ্যে কমিশনভিত্তিক সিন্ডিকেটের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে কমিশনের ভিত্তিতে ফাহিম গ্রুপের কাছে পৌঁছে দিতেন। এ কাজে নুরুল ইসলাম, সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী স্বপনসহ আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রমতে, সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। অনেকের দাবি, তাকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুরো চক্রের কার্যক্রম ও অর্থ লেনদেনের প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে সাংবাদিকরা নানা ধরনের চাপ ও ভয়ভীতির মুখোমুখি হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, ফাহিম গ্রুপের চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এমনকি সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বন্ড লাইসেন্স ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কারখানা ও গুদাম ব্যবস্থাপনায় বন্ড লাইসেন্সের শর্ত পূরণের বিষয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ড সুবিধা রপ্তানিমুখী শিল্পের উন্নয়নের জন্য দেওয়া হলেও এর অপব্যবহার হলে রাষ্ট্রের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি অবৈধ অর্থ লেনদেনের ঝুঁকি তৈরি হয়।
তদন্তের দাবি
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে জরুরি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন—
চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা সব কন্টেইনারের পূর্ণাঙ্গ তল্লাশি;
ঘোষণাপত্র ও প্রকৃত পণ্যের মিল যাচাই;
ফাহিম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন তদন্ত;
সম্ভাব্য মানি লন্ডারিং ও রাজস্ব ফাঁকির অনুসন্ধান;
সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্ট ও বন্দর কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা;
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অর্থ ও পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
এদিকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করছে। ব্যাংক হিসাব, আমদানি নথি, কন্টেইনারের প্রকৃত পণ্য এবং বন্ড সুবিধার ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের প্রস্তুতি চলছে।
