নিজস্ব প্রতিবেদক: ফটিকছড়িতে দিনে গাছ কাটা, রাতে ট্রাকে পাচারের অভিযোগ, নারী নির্যাতন ও গাছ লুটের অভিযোগে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন; ডিআইজির কাছে অভিযোগ জানাতে গিয়ে সাংবাদিককে ‘দুই টাকার সাংবাদিক’ বলার অভিযোগ উঠে এসেছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চুক্তিপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করা গাছবাগান নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে নারী ও কিশোরীর ওপর হামলা, শ্লীলতাহানির চেষ্টা, গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া, মোবাইল ফোন ভাঙচুর, স্বর্ণের চেইন ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, ঘটনাস্থলে পুলিশ একাধিকবার গেলেও গাছ কাটা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, দিনের বেলায় গাছ কেটে এবং রাতের আঁধারে ট্রাকে করে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ—বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির কাছে সাংবাদিকের মাধ্যমে অভিযোগ তুলে ধরার চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ‘দুই টাকার সাংবাদিক’ বলে অপমানজনক মন্তব্য করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ডিআইজির বক্তব্য নেওয়া জরুরি। তিনি এমন কোনো মন্তব্য করে থাকলে তার প্রেক্ষাপটও জানা প্রয়োজন।
চুক্তিপত্রে গাছ বিক্রির তথ্য
ভুক্তভোগী পক্ষের দেওয়া কাগজপত্র অনুযায়ী, ফটিকছড়ি থানাধীন ২১ নম্বর খিরাম ইউনিয়নের উত্তর খিরাম এলাকায় গাছ বিক্রির বিষয়ে একাধিক চুক্তিপত্র রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, ৩১ জুলাই ২০২৬ তারিখে মোহাম্মদ হাসান আলীর সঙ্গে আহম্মদ ছাফার একটি গাছ বিক্রয় চুক্তি হয়। সেখানে গাছের মূল্য ৩ লাখ টাকা এবং চুক্তির মেয়াদ এক বছর উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০১৬ সালেও একই বাগানসংক্রান্ত একটি চুক্তিপত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে গাছ কাটার অধিকার, জমির দখল এবং চুক্তির বৈধতা—সবকিছুই তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
২৩ আগস্ট হামলার অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২৩ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে মোহাম্মদ আমান উল্লাহসহ কয়েকজন ব্যক্তি এবং আরও ৭/৮ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি দা, কিরিচ, লাঠিসোঁটাসহ বাগানে প্রবেশ করে গাছ কাটতে শুরু করেন।
এ সময় বাধা দিলে আহম্মদ ছাফার তিন মেয়ে—জয়নাব, জান্নাত ও সানিয়া মনির ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীর দাবি, একজনের চুলের মুঠি ধরে টানাটানি ও মারধর করা হয়। অন্য দুই বোন এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করা হয়। এমনকি পোশাক টানাহেঁচড়া করে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া একটি মোবাইল ফোন ভাঙচুর, স্বর্ণের চেইন ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
৯৯৯-এ ফোন, ঘটনাস্থলে পুলিশ
ভুক্তভোগী পক্ষের দাবি, পরবর্তীতে জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করা হলে ফটিকছড়ি থানার এএসআই জাহিদুল ঘটনাস্থলে যান।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হয় এবং গাছ কাটার বিষয়টিও দেখতে পায়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরও যদি গাছ কাটা অব্যাহত থাকে, তাহলে পুলিশের পদক্ষেপ কী ছিল?
অভিযোগকারীর দাবি, পুলিশ চলে যাওয়ার পর অভিযুক্তরা আবারও গাছ কাটতে থাকে এবং রাতের বেলায় ট্রাকে করে গাছ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
‘সবাই আমার কাছে আসে’—ওসির বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন
ভুক্তভোগী পক্ষের আরও অভিযোগ, অভিযুক্তদের কয়েকজনকে থানার ওসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আড্ডা দিতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি নাকি বলেন, “সবাই আমার কাছে আসে।”
এই বক্তব্যেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন। কারণ কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি থানায় আসা মানেই পুলিশ তার সঙ্গে যোগসাজশ করছে তবে গুরুতর অভিযোগের তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক ও যোগাযোগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা পরিষ্কার করা পুলিশের দায়িত্ব।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ফটিকছড়ি থানার ওসি হিসেবে রবিউল আলম খান দায়িত্ব পালন করছেন এবং ১৭ আগস্ট চট্টগ্রাম রেঞ্জের পক্ষ থেকে তাঁকে বিশেষ সম্মাননাও দেওয়া হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিআইজির কাছে অভিযোগ জানাতে গিয়ে সাংবাদিককে অপমানের অভিযোগ
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিক যখন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন, তখন সাংবাদিকের বক্তব্য শোনার পরিবর্তে তাকে ‘দুই টাকার সাংবাদিক’ বলে অপমান করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর। কারণ একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন পছন্দ না হলে তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করা যেতে পারে, তথ্য চাওয়া যেতে পারে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পাঠানো যেতে পারে। কিন্তু একজন গণমাধ্যমকর্মীকে অপমানজনক ভাষায় সম্বোধন করা হয়েছে কি না—তা অবশ্যই তদন্তযোগ্য বিষয়।
বিশেষ করে ডিআইজি নিজেই সম্প্রতি পুলিশকে পেশাদারিত্ব, সক্রিয়তা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
‘দুই টাকার সাংবাদিক’—কাকে বলা হলো, কেন বলা হলো?
একজন সাংবাদিকের সংবাদ বা অনুসন্ধানের সঙ্গে দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু সংবাদকর্মীর পেশাগত পরিচয়কে অবমূল্যায়ন করার অভিযোগ উঠলে প্রশ্ন থেকেই যায়—
একজন সরকারি কর্মকর্তা কি কোনো সাংবাদিককে তাঁর প্রশ্নের কারণে অপমানজনক ভাষায় সম্বোধন করতে পারেন?
আর যদি বক্তব্যটি সত্যিই দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ডিআইজি কি ব্যাখ্যা দেবেন—কোন তথ্যের ভিত্তিতে একজন সাংবাদিককে ‘দুই টাকার সাংবাদিক’ বলা হলো?
‘মাশোয়ারা’ ও ‘হ্যানসাম পেমেন্ট’—গুরুতর অভিযোগ,
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে বন ও গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে মাঠকর্মী, গ্রাম পুলিশসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত ‘মাশোয়ারা’ এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অর্থ যাওয়ার যে দাবি উঠেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর।
এসব বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
প্রশাসনের সামনে ৭টি প্রশ্ন
১. চুক্তিপত্রের বিষয়টি যাচাই করে গাছ কাটার প্রকৃত অধিকার কার—তা কি নির্ধারণ করা হয়েছে?
২. ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের জিডি/রিপোর্টে কী উল্লেখ করা হয়েছে?
৩. পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরও গাছ কাটার অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
৪. নারী ও কিশোরীর ওপর হামলা ও শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগের তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়েছে?
৫. রাতের বেলায় ট্রাকে করে গাছ পাচারের অভিযোগ সত্য হলে ট্রাকগুলো আটক বা গাছের চালান যাচাই করা হয়েছে কি?
৬. মামলা গ্রহণে কোনো বিলম্ব হয়ে থাকলে তার কারণ কী?
৭. সাংবাদিকের সঙ্গে ডিআইজি বা তাঁর কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা অপমানজনক আচরণ করে থাকলে বিষয়টি কি তদন্ত করা হবে?
সাংবাদিকের কণ্ঠ রোধ নয়, অভিযোগের তদন্ত চাই
গাছবাগান নিয়ে ব্যক্তিগত বা চুক্তিগত বিরোধ থাকলে তার সমাধান আদালত ও আইনের মাধ্যমে হতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যদি নারী নির্যাতন, জোরপূর্বক গাছ কাটা, অস্ত্র প্রদর্শন, হুমকি এবং রাতের আঁধারে গাছ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গড়ায়, তাহলে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলার আওতায় চলে আসে।
আর কোনো সাংবাদিক সেই অভিযোগের তথ্য জানতে চাইলে তাঁর কণ্ঠ রোধের পরিবর্তে তথ্য, নথি ও তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করাই হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল আচরণ।
এখন দেখার বিষয়—ফটিকছড়ির গাছবাগান নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, নাকি অভিযোগকারীরা আরও অসহায় হয়ে পড়বেন?
আরও গুরুত্বপূর্ণ—একজন সাংবাদিককে ‘দুই টাকার সাংবাদিক’ বলার অভিযোগ সত্য হলে তার জবাবদিহি কোথায়?
জনস্বার্থে আইজিপি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পক্ষ ও স্থানীয় সচেতন মহল।
