শিব ব্রত চক্রবর্ত্তী(বিশেষ প্রতিনিধি)
**************************”
গণমাধ্যমের রূপান্তর ও বিবর্তনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে রেডিও, টেলিভিশন হয়ে আজকের এই নিউ মিডিয়া বা ডিজিটাল যুগে তথ্যের আদান-প্রদান যতটা সহজ হয়েছে, ঠিক ততটাই জটিল হয়েছে এর বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা।
বর্তমান সাংবাদিকতা নিয়ে অনেকেই সময়োপযোগী ও তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছেন
“এখন আর সাংবাদিকতা নেই। কারণ, এখন সাংবাদিক তৈরি হচ্ছে না। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যার হাতে মোবাইল আছে- সবাই সাংবাদিক। এটাকে বলা যায় ‘হঠাৎ সাংবাদিক’।”
এই মন্তব্যটি কেবল একটি আক্ষেপ নয়, বরং এটি সমসাময়িক গণমাধ্যমের এক নির্মম বাস্তবতার নিরেট প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তির গণতান্ত্রিকীকরণ আমাদের প্রতিটি নাগরিকের হাতে তথ্যের ক্ষমতা তুলে দিয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু এর সমান্তরালে পেশাদারিত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, এবং জবাবদিহিতার যে চরম সংকট তৈরি হয়েছে, তা আজ আমাদের গণমাধ্যমকে এক মহাসংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
স্মার্টফোন এবং সস্তা ইন্টারনেটের যুগে তথ্যের প্রবাহ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আজ একজন সাধারণ পথচারী কোনো একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে মুহূর্তের মধ্যে তার মোবাইল ক্যামেরায় তা ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারেন। ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ভিডিও কিংবা টিকটকের মাধ্যমে এই তথ্য সেকেন্ডের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। একে আমরা অনেক সময় ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা নাগরিক সাংবাদিকতা বলে অভিহিত করি।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই নাগরিক সাংবাদিকতা এবং‘হঠাৎ সাংবাদিকতা’ কি এক বিষয়? উত্তর হলো—না। নাগরিক সাংবাদিকতার একটি ইতিবাচক দায়বদ্ধতা থাকে, যেখানে সাধারণ মানুষ মূলধারার গণমাধ্যমের চোখ এড়িয়ে যাওয়া অন্যায় বা অনিয়ম তুলে ধরে। পক্ষান্তরে, ‘হঠাৎ সাংবাদিকতা’ হলো এক ধরণের হুজুগ বা ভাইরাল সংস্কৃতির ফসল।
যেখানে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের কোনো বালাই থাকে না, কোনো গেটকেপিং বা সম্পাদনা প্যানেল থাকে না, এবং সবচেয়ে বড় কথা—এখানে কোনো জবাবদিহিতা থাকে না। হাতে একটা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট থাকলেই যে কেউ নিজেকে ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিয়ে যত্রতত্র ইন্টারভিউ নেওয়া, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা বা বিভ্রান্তিকর শিরোনামে কনটেন্ট তৈরি করা শুরু করে দিচ্ছে। এই ধারাটিই প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতার মূল চরিত্রকে গ্রাস করছে।
দেশবাসীর সবচেয়ে বড় সত্যটি লুকিয়ে আছে এখানে—”এখন সাংবাদিক তৈরি হচ্ছে না।” একটি সময়ে সংবাদকক্ষগুলো ছিল একেকটি বিদ্যাপীঠ। একজন তরুণ যখন শিক্ষানবিস হিসেবে কোনো প্রথিতযশা সংবাদপত্রে বা টেলিভিশনে যোগ দিতেন, তখন প্রবীণ সম্পাদক বা বার্তা সম্পাদকদের হাত ধরে তিনি তৈরি হতেন। তথ্যের ক্রস-চেকিং বা দ্বিমুখী যাচাই কীভাবে করতে হয়, কোন তথ্য প্রকাশযোগ্য আর কোনটি মানহানিকর, শব্দের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত—এসব নিয়মনীতি বছরের বছর কাজ করে শিখতে হতো।
বর্তমান সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদকক্ষগুলো নিজেরাই অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। অর্থনৈতিক মন্দা, কর্পোরেট স্বার্থের সংঘাত, এবং বিজ্ঞাপন রাজস্বের তীব্র ঘাটতির কারণে মূলধারার গণমাধ্যমগুলো আজ কোণঠাসা। ফলে, নতুন প্রতিভাদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও যোগ্য পারিশ্রমিক দিয়ে তৈরি করার মতো ধৈর্য ও সক্ষমতা অনেক প্রতিষ্ঠানেরই নেই। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের কারণে অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমগুলো আপস করতে বাধ্য হচ্ছে। যখন মূলধারা তার বিশ্বাসযোগ্যতা বা সাহসিকতা হারায়, তখন স্বভাবতই মানুষ বিকল্প উৎসের সন্ধান করে। আর এই শূন্যস্থানেই জন্ম নেয় অপেশাদার ‘হঠাৎ সাংবাদিকতা’।
বর্তমান তথ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—এখানে তথ্যের গভীরতা বা সত্যতার চেয়ে ‘ভিউ’ এবং ‘রিঅ্যাকশন’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি যা মানুষের আবেগ, রাগ বা উত্তেজনাকে পুঁজি করে কাজ করে। একটি বস্তুনিষ্ঠ, সুসম্পাদিত এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের চেয়ে একটি চটকদার, মিথ্যা কিংবা অর্ধসত্য শিরোনামের ভিডিও অনেক দ্রুত ভাইরাল হয়।
তথ্য যেখানে বাণিজ্যের প্রধান কাঁচামাল এবং অ্যালগরিদম যেখানে বিচারক, সেখানে বস্তুনিষ্ঠতা সবসময় পরাজিত হয়। ‘হঠাৎ সাংবাদিকেরা’ এই অ্যালগরিদমের চরিত্র খুব ভালো বোঝে। তারা জনমানুষের কৌতূহল এবং সস্তা আবেগকে কাজে লাগিয়ে কনটেন্ট তৈরি করে, যা মূলধারার সংবাদকেও অনেক সময় প্রভাবিত করে ফেলে।
এর ফলে তৈরি হয়েছে ‘ক্লিকবেইট’ সংস্কৃতি। মূলধারার অনেক গণমাধ্যমও টিকে থাকার তাগিদে বা ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্টগুলোর পেছনে ছুটছে। ফেসবুকের কোনো ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে মূলধারার সংবাদপত্রে লিড নিউজ হওয়ার প্রবণতা এখন আর বিরল নয়। এটি প্রমাণ করে যে, এজেন্ডা সেটিং বা সংবাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষমতা আজ প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যমের হাত থেকে অনেকটাই ফসকে গেছে।
সাংবাদিকতার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো নৈতিকতা । তথ্যের কারণে যেন কোনো নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, কারো মানবাধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়—তা নিশ্চিত করা একজন সাংবাদিকের পবিত্র দায়িত্ব। কিন্তু ‘হঠাৎ সাংবাদিকদের’ কাছে এই নৈতিকতার কোনো মূল্য নেই। ভিউ থেকে অর্জিত ডলার কিংবা সস্তা জনপ্রিয়তাই তাদের মূল চালিকাশক্তি।
এর সামাজিক পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কোনো একটি ঘটনার গভীর অনুসন্ধান না করেই কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া, ব্যক্তিগত জীবনের সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কুরুচিপূর্ণ লাইভ সম্প্রচার করা এবং গুজব ছড়িয়ে সমাজে সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক দাঙ্গা উসকে দেওয়ার মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। মানুষ যখন এই ধরণের কনটেন্ট ও মূলধারার সংবাদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না, তখন সামগ্রিকভাবে পুরো সাংবাদিকতা পেশাটির ওপরেই জনগণের আস্থা উঠে যায়। আজ সাধারণ মানুষের চোখে ‘সাংবাদিক’ শব্দটির মর্যাদা যেখানে এসে ঠেকেছে, তা এই অপেশাদারিত্বেরই ফসল।
এই অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? গণমাধ্যম কি তবে চিরতরে তার গৌরব হারিয়ে ফেলবে? জনতার এই সময়োচিত সতর্কবার্তাকে একটি সুযোগ হিসেবে নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
মূল শক্তিতে প্রত্যাবর্তন: প্রাতিষ্ঠানিক গণমাধ্যমগুলোকে তাদের নিজেদের মূল শক্তিতে ফিরে যেতে হবে, যা হলো—বিশ্বাসযোগ্যতা ও গভীরতা। ব্রেকিং নিউজের পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতকরণ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় জোর দিতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়া যা কখনোই দিতে পারবে না, তা হলো একটি তথ্যের পেছনের গভীর বিশ্লেষণ এবং সত্য-মিথ্যার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমকে সেই জায়গাটি দখল করতে হবে।
প্রশিক্ষণ ও কাজের পরিবেশ: নতুন সাংবাদিক তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও সংবাদকক্ষগুলোর কাজের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাংবাদিকতা বিভাগ এবং পেশাদার সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি সমন্বয় প্রয়োজন, যাতে তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক ও নৈতিক শিক্ষার সঠিক প্রতিফলন ঘটে।
ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি: সাধারণ পাঠক ও দর্শকদের বুঝতে হবে যে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে জোরে কথা বললেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যায় না। তথ্যের উৎস যাচাই করার মানসিকতা সমাজ স্তরে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি, অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্ট প্রতিরোধের জন্য সাইবার আইন ও প্রেস কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন, কার্যকর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রযুক্তিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, এবং মোবাইল হাতে থাকা প্রতিটি নাগরিকই তথ্যের একেকটি সম্ভাব্য উৎস—এটিই আধুনিক পৃথিবীর নিয়ম। কিন্তু তথ্য সরবরাহকারী আর সাংবাদিকের মধ্যে যে একটি সুষ্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী রেখা রয়েছে, তা ভুলে গেলে চলবে না।
আমাদের গণমাধ্যমকে যদি টিকে থাকতে হয় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে তার গৌরব ধরে রাখতে হয়, তবে প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই। ‘হঠাৎ সাংবাদিকতার’ এই হুজুগ সাময়িক হতে পারে, কিন্তু একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে বস্তুনিষ্ঠ, সৎ এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা চিরন্তন। গণমাধ্যমকে এখন বেছে নিতে হবে সে কি ভাইরালের স্রোতে গা ভাসিয়ে বিলীন হয়ে যাবে, নাকি সত্যের মশাল জ্বেলে তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করবে।
——————-
হঠাৎ সাংবাদিক’ বনাম প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা কোন পথে আমাদের গণমাধ্যম
