নটরাজ এন. এ পলাশ, ঢাকা।
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো পরীক্ষামূলক নীতির ক্ষেত্র নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও জনগণের আস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পুলিশের পোষাক পরিবর্তনের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা আজ নানা প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে-এটি কি প্রয়োজনীয় সংস্কার ছিল, নাকি একটি অপরিণামদর্শী পদক্ষেপ?
পুলিশ বাহিনীর পোষাক শুধু একটি ইউনিফর্ম নয়; এটি বহু বছরের ঐতিহ্য, পেশাদারিত্ব ও জনগণের কাছে পরিচিত একটি প্রতীক। সেই প্রতীককে হঠাৎ পরিবর্তন করা মানে শুধুমাত্র বাহ্যিক রূপ বদলানো নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠিত পরিচয়কে অস্থির করে তোলা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই এখন ‘অপরিকল্পিত’ এবং ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে আখ্যায়িত করছেন।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর নৃশংস হামলা-পুড়িয়ে হত্যার মতো ঘটনার প্রেক্ষাপটে-এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন তাদের প্রতীকী শক্তিকে দুর্বল করে এমন সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত ছিল, তা নিয়ে সুধীসমাজে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
সুধীসমাজের একটি বড় অংশ মনে করছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই পদক্ষেপ পুলিশ বাহিনীর মনোবল ও পরিচিতিকে আঘাত করেছে। তাদের ভাষায়, “যে সময়ে বাহিনীর সক্ষমতা ও ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল, সে সময়েই একটি বিভ্রান্তিকর পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।” ফলে বাহিনীর ভেতরে ও বাইরে-উভয় ক্ষেত্রেই এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এই সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। তাদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ হওয়া উচিত ছিল স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বড় ধরনের প্রতীকী পরিবর্তন আনা নয়। অথচ তারা এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা পরবর্তীতে বর্তমান সরকারের জন্য নতুন করে জটিলতা তৈরি করেছে। এখন এই সিদ্ধান্তের দায়ভার কার্যত বর্তমান সরকারের কাঁধেই এসে পড়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যখন দেখা যায় যে, মৌলিক প্রতীক ও কাঠামো বারবার পরিবর্তিত হচ্ছে, তখন তা অনিশ্চয়তার বার্তা দেয়। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকরাও সাধারণত এ ধরনের পরিবর্তনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। একটি দেশের পুলিশ বাহিনীর পরিচিত রূপ হঠাৎ বদলে যাওয়া অনেক সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে যখন সেই পরিবর্তনের পেছনে সুস্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেখা যায় না, তখন তা দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
এই বাস্তবতায় ক্রমেই জোরালো হচ্ছে একটি দাবি-বর্তমান সরকারের উচিত পুলিশের পূর্বের পোষাক পুনর্বহাল করা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হবে না; বরং এটি হবে একটি শক্ত বার্তা-যেখানে সরকার স্থিতিশীলতা, ধারাবাহিকতা ও বাস্তবতার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
পোষাক পুনর্বহাল করা হলে তা পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে, একই সঙ্গে জনগণের কাছেও একটি পরিচিত ও আস্থার প্রতীক ফিরে আসবে। পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একটি ইতিবাচক সংকেত দেবে যে, দেশটি অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার বদলে প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া এই সিদ্ধান্ত আজ একটি বাস্তব সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এখন সময় এসেছে তা সংশোধনের। বর্তমান সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে-একটি সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর মর্যাদা, আস্থা এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করার।
পুলিশের পোষাক পরিবর্তন: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্তের খেসারত-বর্তমান সরকারের সামনে পুনর্বহালের দাবি জোরালো
