🔴 ব্রেকিং
পটুয়াখালীতে সড়কের পাশের গর্ত থেকে শিশুর মরদেহ উদ্ধার পবিত্র হজ্জ পালন শেষে প্রত্যাবর্তন ও দায়িত্ব গ্রহণ করলেন পবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান পটুয়াখালীতে “চাইপাই” রেষ্টুরেন্টে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য মজুদের অভিযোগ পটুয়াখালীতে ৪১ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়ায় ১০ কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ১ গোপালগঞ্জে পুলিশের (অব:) বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর অভিযোগ বেগমগঞ্জে বিদেশী ৩টি অত্যাধুনিক অস্ত্র সহ জামাত ক্যাডার গ্রেপ্তার গোপালগঞ্জে সরকারি জমিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মাটি কাটার অভিযোগে গ্রেফতার-১ সৌদি আরবে অবৈধ প্রবাসীদের গ্রেফতারের হিরিক শ্রীপুরে পূর্ণ বেতনের দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন,সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ

অসমাপ্ত ডিগ্রি, অসমাপ্ত সময়: তারেক রহমান বিতর্কে আমাদের রাজনৈতিক মানসিকতার প্রতিচ্ছবি

👤 🕐 ✏️ আপডেট: 👁 28 বার পড়া হয়েছে 7 মিনিট পড়তে হবে
অসমাপ্ত ডিগ্রি, অসমাপ্ত সময়: তারেক রহমান বিতর্কে আমাদের রাজনৈতিক মানসিকতার প্রতিচ্ছবি

শফিউল বারী রাসেল:লেখক ও কলামিস্ট (ক্রাইম পেট্রোল ইনভেষ্টিগেশন)
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তি কখনও শুধু ব্যক্তি থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন প্রতীক, পক্ষ, ঘৃণা, ভালোবাসা কিংবা প্রতিশোধের ভাষা। ফলে তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা আর নিছক তথ্যভিত্তিক থাকে না; সেটি পরিণত হয় রাজনৈতিক অবস্থানের পরীক্ষায়। তারেক রহমান-এর শিক্ষাজীবন নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই পুরোনো বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। কেউ তাঁকে ব্যর্থ ছাত্র হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, কেউ আবার তাঁকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার বলছেন। কিন্তু এই দুই মেরুর মাঝখানে যে বাস্তবতা আছে, সেটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।

একটি সমাজ যখন রাজনৈতিক বিভাজনে অতিমাত্রায় আক্রান্ত হয়, তখন সেখানে মানুষের পরিচয় সংকুচিত হয়ে যায়। একজন মানুষ কী পড়েছেন, কোথায় পড়েছেন, কী শেষ করতে পারেননি এসব প্রশ্ন আর মানবিক কৌতূহলের জায়গায় থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অস্ত্র। বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই আমরা এই সংস্কৃতি দেখছি। এখানে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অর্জনকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা যেমন কঠিন, তেমনি তাঁর সীমাবদ্ধতাকেও মানবিকভাবে দেখা প্রায় অসম্ভব।

তারেক রহমানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে যে আলোচনা চলছে, সেখানে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক ইতিহাস। আশির দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আজকের প্রজন্ম কল্পনাও করতে পারবে না। তখন বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষার জায়গা ছিল না; সেটি ছিল ক্ষমতার সংঘর্ষ, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ছাত্ররাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অনিশ্চয়তার কেন্দ্র। ক্লাসরুমের চেয়ে মিছিল বড় ছিল, লাইব্রেরির চেয়ে স্লোগান জোরালো ছিল আর শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের চেয়ে নিরাপত্তাহীনতা ছিল অনেক বেশি বাস্তব।

এই প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর অসমাপ্ত শিক্ষাজীবন বিচার করা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ব্যক্তিগত মেধা বা পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সামাজিক স্থিতি, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। একজন ছাত্র যদি এমন এক সময়ের মধ্যে পড়েন যখন ক্যাম্পাসে অস্ত্রের ঝনঝনানি, সংঘর্ষ, নিরাপত্তা আতঙ্ক এবং দীর্ঘ সেশনজট স্বাভাবিক বাস্তবতা, তাহলে তাঁর শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

সমস্যা হলো, আমরা ইতিহাসকে প্রেক্ষাপটসহ দেখতে চাই না। আমরা ফলাফল দেখি, কিন্তু যাত্রাপথ দেখি না। একজন ছাত্র অনার্স শেষ করতে পারেননি শুনলেই আমরা তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা করি, অথচ কেন পারেননি, কী পরিস্থিতি ছিল, তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কী ছিল সেসব নিয়ে ভাবতে আগ্রহী নই। এই প্রবণতা শুধু তারেক রহমানের ক্ষেত্রে নয়; আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই এটি গভীরভাবে গেঁথে গেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরিত্রহনন বহু পুরোনো কৌশল। এখানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তাকে বিদ্রূপের পাত্রে পরিণত করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। এখন তথ্যের চেয়ে ব্যঙ্গ দ্রুত ছড়ায়, সত্যের চেয়ে ট্রল বেশি জনপ্রিয় হয়। ফলে একজন মানুষের জীবনের জটিল বাস্তবতা কয়েকটি কৌতুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।

তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়েও একই ঘটনা ঘটছে। অথচ বিভিন্ন শিক্ষক, সহপাঠী এবং বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে যে চিত্র উঠে আসে, তা অনেক বেশি মানবিক। সেখানে দেখা যায়, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন, পড়াশোনার চেষ্টা করেছিলেন, বিভাগ পরিবর্তন করেছিলেন, সহপাঠীদের সঙ্গে মিশেছিলেন। অর্থাৎ তিনি কোনো কাল্পনিক চরিত্র নন; তিনি সেই সময়ের বাস্তব এক শিক্ষার্থী।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে। একজন মানুষ যদি তাঁর অসম্পূর্ণ শিক্ষাজীবন নিয়ে মিথ্যা দাবি না করেন, তাহলে সেটিকে কি অন্তত সততা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়? বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেখানে অনেকে নিজেদের পরিচয় বাড়িয়ে বলার চেষ্টা করেন, সেখানে নিজের শিক্ষাগত সীমাবদ্ধতা গোপন না করাটা একটি আলাদা দিক নির্দেশ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনীতিতে সততাও প্রায়ই বিদ্রূপের শিকার হয়।

আরও গভীরভাবে দেখলে, এই বিতর্ক শুধু তারেক রহমানকে নিয়ে নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। আমরা এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে একজন তরুণের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ভেঙে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেই দায় কার? একজন ছাত্রের, নাকি সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার, যা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিরাপদ ও কার্যকর রাখতে ব্যর্থ হয়েছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস খুলে দেখলে দেখা যাবে, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সেশনজট বহু শিক্ষার্থীর জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কেউ সময়মতো পরীক্ষা দিতে পারেননি, কেউ পরিবার ও নিরাপত্তার কারণে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কেউ রাজনীতির সংঘাতে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছেন। এই বাস্তবতা শুধু কোনো এক দলের নয়; এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মিলিত ফল।

কিন্তু আমাদের জনপরিসরে ইতিহাসকে খুব কমই নিরপেক্ষভাবে আলোচনা করা হয়। এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ই শেষ কথা। আপনি যদি একটি পক্ষের হন, তাহলে আপনার সব ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করা হবে। আর আপনি যদি প্রতিপক্ষের হন, তাহলে আপনার প্রতিটি সীমাবদ্ধতা উপহাসে পরিণত হবে। এই সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক, কারণ এতে সত্য নয়, পক্ষপাতই প্রধান হয়ে ওঠে।

আরেকটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়, আমরা ব্যক্তি-মানুষকে দেখতে ভুলে যাচ্ছি। একজন রাজনৈতিক নেতা মানেই তিনি কেবল বক্তৃতা, ক্ষমতা বা বিতর্ক নন। তাঁরও একটি ব্যক্তিগত জীবন আছে, তরুণ বয়সের স্বপ্ন আছে, ব্যর্থতা আছে, অপূর্ণতা আছে। একজন মানুষের অসমাপ্ত ডিগ্রি তাঁর পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে না। ইতিহাসে বহু প্রভাবশালী নেতা, চিন্তাবিদ কিংবা উদ্যোক্তার শিক্ষাজীবনও অসম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু তাঁদের মূল্যায়ন হয়েছে তাঁদের সামগ্রিক ভূমিকা দিয়ে।

বাংলাদেশে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এখনো ব্যক্তিকে তাঁর পূর্ণতায় বিচার করতে শিখিনি। আমরা হয় অন্ধ সমর্থন করি, নয়তো অন্ধ ঘৃণা করি। মাঝখানের যুক্তিবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে একটি সাধারণ মানবিক বিষয়ও রাজনৈতিক সংঘর্ষে পরিণত হয়।

এই বিতর্ক আমাদের আরেকটি বড় সংকটও মনে করিয়ে দেয়, তা হলো রাজনৈতিক সৌজন্যের অভাব। মতভেদ থাকবে, সমালোচনা থাকবে, প্রশ্নও থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন করার ভাষা যদি অপমাননির্ভর হয়, তাহলে সেটি আর সত্য অনুসন্ধান থাকে না; সেটি হয়ে যায় চরিত্রহননের রাজনীতি। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই সমালোচনারও নৈতিকতা থাকা দরকার।

তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়, আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক মানসিকতাকেও দেখতে হবে। আমরা কি সত্যিই তথ্যভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে চাই, নাকি আমরা কেবল নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য তথ্যকে ব্যবহার করি? আমরা কি একজন মানুষকে তাঁর সময়ের বাস্তবতার ভেতর দিয়ে বুঝতে পারি, নাকি আমরা সবকিছুকে সরল ব্যঙ্গের মধ্যে নামিয়ে আনি?

এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো শুধু একজন নেতাকে নয়, পুরো সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থাকেই প্রকাশ করে। একটি সমাজ যখন মানবিক জটিলতাকে বুঝতে শেখে না, তখন সেখানে সহনশীলতা কমে যায়। তখন সত্যও দলীয় হয়ে পড়ে।

সবশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে বিতর্কের চেয়ে বড় বিষয় হলো এই বিতর্ককে আমরা কীভাবে দেখি। যদি আমরা এটিকে কেবল রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার বানাই, তাহলে আমরা সত্য হারাব। আর যদি আমরা এটিকে একটি সময়, একটি প্রজন্ম এবং একটি অস্থির রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখি, তাহলে হয়তো অনেক গভীর বাস্তবতা বুঝতে পারব।

একজন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন, পড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু উত্তাল সময় তাঁকে পূর্ণতা পেতে দেয়নি। এই গল্পে রাজনীতি আছে, ইতিহাস আছে, ব্যক্তিগত অপূর্ণতা আছে, আবার রাষ্ট্রের দায়ও আছে। আর সম্ভবত এখানেই সবচেয়ে বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে কোনো মানুষের অসমাপ্ত পথচলাকে উপহাস করার আগে সেই পথের কাঁটাগুলোও দেখা দরকার।

লেখক: শফিউল বারী রাসেল (কবি, গীতিকার ও সাংবাদিক)

শেয়ার করুন: 📘 Facebook 𝕏 Twitter
Mijanur Rahman
Mijanur Rahman
ক্রাইম পেট্রোল নিউজের সংবাদদাতা।
সব লেখা দেখুন →

💬 মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

f 📲 𝕏