ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চুক্তিপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করা গাছবাগানে সংঘবদ্ধভাবে প্রবেশ করে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বাগানের মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা, মারধর, শ্লীলতাহানির চেষ্টা, মোবাইল ফোন ভাঙচুর, স্বর্ণের চেইন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও দুর্বৃত্তরা গাছ কাটা বন্ধ করেনি। এমনকি অভিযোগের প্রায় পরপরই নতুন করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ফটিকছড়ি থানায় মামলা রুজু হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ফটিকছড়ি থানাধীন ২১ নম্বর খিরাম ইউনিয়নের উত্তর খিরাম এলাকার একটি গাছবাগানকে কেন্দ্র করে।
চুক্তিপত্রে কী আছে?
প্রাপ্ত কাগজপত্রে দেখা যায়, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে মোহাম্মদ হাসান আলীর সঙ্গে মোহাম্মদ আমান উল্লাহর একটি গাছ বিক্রয়ের চুক্তিপত্র সম্পাদিত হয়। চুক্তিতে গাছবাগানের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬ লাখ টাকা। সেখানে ৩ লাখ টাকা অগ্রিম এবং বাকি টাকা গাছ কর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিশোধের কথা উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিটির মেয়াদ ছিল ছয় মাস।
অভিযোগকারীর দাবি, পরবর্তীতে ওই চুক্তি নিয়ে অর্থনৈতিক বিরোধ সৃষ্টি হলে মূল মালিক আমান উল্লাহর কাছ থেকে বাগান ফেরত নেন এবং তার দেওয়া চেক ফেরত দেন। এ নিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে নোটিশ দেওয়ার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ২০১৭ সাল থেকে অভিযোগকারী আহম্মদ ছাফা ওই বাগান দেখাশোনা ও তত্ত্বাবধান করে আসছেন বলে এজাহারে দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, ৩১ জুলাই ২০২৬ তারিখে মোহাম্মদ হাসান আলীর সঙ্গে আহম্মদ ছাফার আরেকটি গাছ বিক্রয়ের চুক্তিপত্র পাওয়া গেছে। ওই দলিলে গাছের মূল্য ৩ লাখ টাকা এবং সম্পূর্ণ টাকা নগদে পরিশোধের কথা উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ ৩১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত এক বছর। চুক্তিতে লিচু ও আমগাছ বাদে আর.এস. ১০৬০ দাগের টিলা জমিতে থাকা গাছ বিক্রয়ের কথা বলা হয়েছে।
২৩ আগস্টের ঘটনায় হামলার অভিযোগ
আহ্মদ ছাফার ফটিকছড়ি থানায় দেওয়া এজাহারে বলা হয়েছে, ২৩ আগস্ট ২০২৬ সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে মোহাম্মদ আমান উল্লাহসহ কয়েকজন ব্যক্তি এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৭/৮ জন দা, কিরিচ, লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাগানে প্রবেশ করেন।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা গাছ কাটতে শুরু করলে তার তিন মেয়ে—জয়নাব (২৬), জান্নাত (২২) ও সানিয়া মনি (১৪)—প্রতিবাদ করেন। এ সময় তাদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও দাবি করা হয়, ১ নম্বর অভিযুক্ত জয়নাবের চুলের মুঠি ধরে টানাটানি ও লাঠি দিয়ে মারধর করেন। তাকে উদ্ধারে অন্য দুই বোন এগিয়ে এলে তাদেরও মারধর করা হয়। এ সময় তাদের পোশাক টানাহেঁছড়া করে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়, যার মূল্য আনুমানিক ৩০ হাজার টাকা। একই সময় প্রায় এক ভরি ওজনের স্বর্ণের চেইন, আনুমানিক মূল্য ২ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং মোবাইল ফোনের কভারে থাকা ৫ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
আহতদের স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে নাজিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও গাছ কাটা বন্ধ হয়নি?
অভিযোগকারী জানান, ঘটনার পর তিনি থানায় অভিযোগ করেন। পরে ২৭ আগস্ট ২০২৬ দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও পরিদর্শন করেন।
কিন্তু অভিযোগকারীর দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার পর অভিযুক্তরা বিষয়টি জানতে পেরে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
এরপর ২৯ আগস্ট ২০২৬ অভিযুক্তরা ফের জোরপূর্বক বাগানে ঢুকে গাছ কাটা শুরু করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষ থেকে ফটিকছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানানো হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। কিন্তু পুলিশ চলে আসার পরও গাছ কাটা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
‘প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখানোর অভিযোগ
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, পুলিশকে অবহিত করা এবং ঘটনাস্থলে পুলিশ যাওয়ার পরও যদি প্রকাশ্যে গাছ কাটা চলতে থাকে, তাহলে তারা কার্যত প্রশাসনের নির্দেশনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিকে উপেক্ষা করছে।
অভিযোগকারীর দাবি, বর্তমানে অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করছে এবং তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দিচ্ছে। ফলে শুধু গাছবাগান রক্ষাই নয়, তার পরিবারের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি।
মামলা না নেওয়ার অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে—২৯ আগস্টের ঘটনা এবং পূর্বের হামলা ও গাছ কাটার অভিযোগ নিয়ে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ফটিকছড়ি থানায় মামলা রুজু হয়নি।
ভুক্তভোগী পক্ষের প্রশ্ন, প্রকাশ্যে গাছ কাটার অভিযোগ, নারী ও কিশোরীর ওপর হামলার অভিযোগ, ছিনতাই, ভাঙচুর এবং প্রাণনাশের হুমকির মতো অভিযোগ ওঠার পরও কেন দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
তবে অভিযোগে উত্থাপিত সব বিষয়ই অভিযোগকারীর বক্তব্য ও এজাহারে বর্ণিত তথ্য; এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযুক্তদের বক্তব্যও পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সমান গুরুত্বে প্রকাশ করা হবে।
প্রশাসনের কাছে ৫টি প্রশ্ন
১. চুক্তিপত্রের মাধ্যমে গাছ ক্রয়ের দাবি করা পক্ষের বাগানে প্রবেশ ও গাছ কাটার ঘটনায় আইনগত অবস্থান কী?
২. পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরও যদি গাছ কাটা অব্যাহত থাকে, তাহলে কারা গাছ কাটছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
৩. নারী ও কিশোরীর ওপর হামলা, শ্লীলতাহানির চেষ্টা, মোবাইল ভাঙচুর ও স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করা হয়েছে কি না?
৪. প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগের পর ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে কি না?
৫. লিখিত এজাহার পাওয়ার পরও মামলা রুজু না হয়ে থাকলে, মামলা গ্রহণে বিলম্বের কারণ কী?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
একটি জমি বা গাছবাগানকে কেন্দ্র করে বিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যদি জোরপূর্বক গাছ কাটা, সংঘবদ্ধ হামলা, অস্ত্র প্রদর্শন, নারী ও কিশোরীর ওপর হামলা এবং প্রাণনাশের হুমকিতে রূপ নেয়, তাহলে বিষয়টি আর নিছক ব্যক্তিগত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—এটি আইনশৃঙ্খলার বিষয়েও পরিণত হয়।
এ অবস্থায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চুক্তিপত্রের বৈধতা, বাগানের প্রকৃত দখল, গাছ কাটার অধিকার, কথিত হামলা ও ছিনতাইয়ের ঘটনা এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ দ্রুত যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী আহম্মদ ছাফা।
প্রশ্ন এখন একটাই—পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পরও যদি গাছ কাটা চলতে থাকে, তাহলে আইনের প্রয়োগ হবে কখন?
ফটিকছড়িতে চুক্তিবদ্ধ গাছবাগান দখলের অভিযোগ, পুলিশ মামলা না নেওয়া ও —‘প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখানোর অভিযোগ
